জীবনের অর্থ খোঁজার প্রয়াসে জীবন থেকে নেয়া কাহিনী অবলম্বনে রচিত ধারাবাহিক উপন্যাস 'জীবনের অন্যপিঠ' পর্ব -১৫।

আপডেট: 2023-08-20 14:14:09

জীবনের অন্যপিঠ -১৫ 

 

অনিরূন্ধকে দেখার আগে বেশ কয়েকবার টেলিফোনে কথা হয়েছে ওর সাথে ডাঃ লাবনীর। চৌধুরী এষ্টেট হাসপাতালে কাজ নেয়ার সুবাদে দেখা হওয়ার আগে টেলিফোনে একে ওপরের পরিচয় দেয়ার সুত্র ধরে ওদের ভিতর হালকা মেজাজে বেশ কথাবার্তা হয়েছে।

ওদের এখানে দেখা হওয়ার পর প্রাথমিক সব কথা হওয়ার শেষে লাবনী ওকে ঠাট্টার ছলে জিজ্ঞেস করলো- তা তুমি এত দেশ বিদেশ ঘুরে শেষে ওই জংগলে কি করছো?
-তোমারই অপেক্ষায়।
ইয়ারকি করলো অনিরূন্ধ।
-মনে রেখ অনিরূদ্ধ আমি তোমার থেকে দুবছরের সিনিয়র।
-ওটাতো কলেজ পাশ করার হিসাবে। তাছাড়া স্ত্রী সিনিয়র হলে সুবিধাই বেশী। কিন্তু সে ভাগ্য কি আমার হবে।
একটু থেমে অনির্বাণ পুনরায় বললো -আমাদের বস, মানে জমিদার তিনি আরো ইয়ং আর হ্যান্ডসাম।
সেদিন হাল্কা রশিকতার ছলে অনেক হাসাহাসি করেছিলো ওরা।

প্রতিদিন এক সাথে ব্রেকফার্ষ্ট সেরে প্রায় পাশাপাশি দুটো কক্ষে বসে ওরা রোগী দেখে। কাজের ফাকে ফাকেও কথাবার্তা হয় ওদের। রোগী না থাকলে বা কম থাকলে মাঝে মাঝেই একসাথে বসে চা খায়, নানা কথাবার্তা বলে একে অপরের কক্ষে বসে।
অনিরূদ্ধকে নিয়ে অনেক ভেবেছে লাবলী। ওকে ভাল লাগে ওর। মাঝে মাধেই নিজের উদ্যোগে কিছু কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়েও আলাপ করে ওর সাথে। অনেক প্রসঙ্গে অনিরূদ্ধ ওর নিজের চিন্তা চেতনার আলোকে অনেক পরামর্শও দেয় লাবনীকে।
লাবনী লক্ষ্য করে অনিরূদ্ধ ওর নিজের ব্যক্তিগত কোন প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করতে খুবই অনীহা প্রকাশ করে। সে রকম কোন প্রসঙ্গ উঠলে অনেকটা বেরসিক ভাবে তা এড়িয়ে যায় বা চুপ করে থাকে।
লাবনী ওর জীবনের পুরা ঘটনা বিভিন্ন সময়ে অনিরূদ্ধকে জানিয়েছে। প্রকারান্তে লাবনী ওর জীবনের এত বড় একটা সীদ্ধান্তহীনতার বিড়ম্বনার কথাও জানিয়েছে অনিরূদ্ধকে।
অনিরূদ্ধ খুব আগ্রহ সহকারে ওর কথাগুলো শুনে সমবেদনা প্রকাশ করেছে। কিন্তু লাবনী লক্ষ্য করেছে যে একটা পর্যায় পর্যন্ত এসে ওর সমবেদনা প্রকাশ আর আগ্রহ থেমে গিয়ে অনিরুদ্ধ একদম নিশ্চুপ থাকে যা লাবনীর কাছে কিছুটা রহস্যজনক লাগে।

প্রফেশান, মানবতা, অর্থনীতি, আভ্যন্তরিন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ইত্যাদি ব্যপারে আলোচনায় অনিরূদ্ধ সবসময়ই খুবই অগ্রহী। ব্যক্তিগত ব্যপার যেমন বাবা মা, লেখাপড়া, শখ, পছন্দ অপছন্দ ইত্যাদি ব্যপারে ওর যারা অন্তরঙ্গ তাদের সাথে আলাপ করে, অনেক হালকা কথাও বলে। কিন্তু ভালবাসা বা তরূন ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্বের বিষয়ে যে কোন আলোচনায় কৌশলে এড়িয়ে যায় ও।
অনিরূদ্ধর এ দিকটা লাবনীর কাছে অস্বাভাবিক লেগে অনেকটা অনিচ্ছাকৃত ভাবেই ওর প্রতি লাবনীকে ভাবিয়েও তুলেছে। কিন্তু আজ অনিরুদ্ধর বিবাহের ব্যাপারে নীলিমা চৌধুরীর নিতান্তই হালকা রসিকতার উত্তরে অনিরূদ্ধর এধরণের মন্তব্যগুলো ওকে সত্যি সত্যিই পুরোপুরি হতচকিত করে দিল।

কাজের মধ্যে একদম ডুবে থাকে অনিরূদ্ধ, কাজে ডুবে নিজেকে ভুলে থাকতে ভাল লাগে ওর। তায়তো এখানকার কাজটাকে ও চাকরী নয় বরং জীবন কাটানোর পাথেয় হিসাবে গ্রহন করেছে। আর দিনে দিনে এই হাসপাতাল তৈরীর জন্য জমিদার অমর চৌধুরীর যে স্বপ্ন সে স্বপ্নটাকে ও নিজের স্বপ্নে পরিণত করেছে।
রামদয়ালের মানবসেবার মানসিকতাকে ও ওর চিকিৎসা কাজের সাথে যুক্ত করে শরীর আর মনের চিকিৎসার মধ্যের ব্যবধানটা দূর করার প্রয়াসে লিপ্ত হয়েছে।
রামদয়ালের সাথে ব্যহ্যিক আর অন্যান্য সব কিছু বিচারে অনেক পার্থক্য থাকলেও অনিরূদ্ধ রামদয়ালের সাথে একটা বিশেষ অভিন্নতা খুজে পেয়েছে।
অনিরূদ্ধ এই বছর খানেকের মধ্যেই এখানকার সাধারণ মানুষের সাথে ওর ব্যবধানটা অনেক কমিয়ে ফেলেছে। রামদয়ালের আয়ুর্বেদ আর ওর আধুনিক চিকিৎসা জ্ঞানকে একাকার করে একে অপরের সহায়ক বানিয়ে মানুষের কল্যানে নিজেকে নিয়োজিত করেছে সে।

একদিন দুপুরের পর অনিরূদ্ধ আর লাবনী কথা বলছিল অনিরূদ্ধর চেম্বারে বসে। রামদয়াল আসলো।
ওকে দেখে ওরা দুজনই আগ্রহী হয়ে উঠলো।
রামদয়ালকে বসতে বললো অনিরদ্ধ।
-আপামনি, সাগরতো আমার পিছনই ছাড়ে না। এখানেও আসবে আমি চৌধুরী মার কাছে দিয়ে তারপর আসলাম। চৌধুরীমাকে খুব পছন্দ করে সাগর।
নীলিমা চৌধুরী খুব ভালবাসে সাগরকে তা জানে ডাঃ লাবনী।
সাগর সকালে উঠে ওই যে যায় আর খোঁজ থাকে না ওর। এবাড়ীর সবার সাথেই ওর শখ্যতা। তবে নীলিমা চৌধুরী আর রামদয়ালের সাথে ওর ভাবটা বেশী। ওকে সময়মত গোসল করিয়ে খাইয়ে দেয়ার দায়িত্বটা নীলিমা চৌধুরী নিজের থেকেই তার কাধে তুলে নিয়েছেন। আর সাগরও স্বাচ্ছন্দ বোধ করে তাতে। একমাত্র রাতে ঘুমানোর সময় বাদে ওকে পায় না লাবনী। তাও কোন কোন দিন ওকে ঘুমানো অবস্থায় কোলে করে আনতে হয় নীলিমা চৌধুরীর ঘর থেকে।

একদিন রাত প্রায় ষাড়ে আটটা বাজলো কিন্তু সাগর আসছে না দেখে লাবনী গেল ওর রূমের পাশেই নীলিমা চৌধুরীর রূমে।
ঘরে আলো জ্বলছে। নীলিমা চৌধুরী পালঙ্কে পা বিছিয়ে হেলান দিয়ে রেডিও শুনছেন। ওর কোলের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে সাগর।
ওকে দেখে নীলিমা চৌধুরী হাতের ঈশারায় বসতে বললেন। পাশে বসে ওর সাথে রেডিও শুনতে লাগলো লাবনী।
হটাৎ করে সাগরের ঘুমন্ত মুখের দিকে নজর পড়তেই দেখলো ওর ঠোটের কোণা দিয়ে লালা পড়ছে। একটু বিব্রত বোধ করে লাবনী ওর শাড়ীর আচল দিয়ে সাগরের চোয়াল থেকে লালাটা মুছে দেয়ার জন্য উঠার চেষ্টা করতেই নীলিমা চৌধুরী বোধহয় খেয়াল করলেন। তিনি তেমনি রেডিওর খবরের দিকে কান রেখেই চট করে ওর খালি হাতটা দিয়ে সাগরের চোয়ালের লালাটা মুছে দিলেন।
নীলিমা চৌধুরীর কাছে যে সাগর নিরাপদ সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই লাবনীর।

রামদয়ালের কথায় ও একটু মুচকি হেসে ওর কৃতজ্ঞতা জানালো।
-স্যার, কাঠুর মা, সখিনাকে দেখতে গিয়েছিলাম সকালে। রজবালী মানে ওর বাবা মেয়েকে গত কাল ওর নতুন শশুর বাড়ী থেকে নিয়ে এসেছে।
অনিরূদ্ধ খুব উৎসুক হয়ে উঠলো রামদয়ালের কথাগুলো গুনে।
-কোথায় ওর বুকের ব্যথা, সব ভালো হয়ে গেছে এখন। বেচারা রজবালীর বয়স মনে হলো দশ বছর কমে গেছে। ওর নতুন জামাই, নূর ইসলাম তিন বছরের কাঠুকে কোলে নিয়ে দিব্যি বেড়াচ্ছে। খুশীতে ভরে গেছে রজবালীর জীর্ণ বাড়ীর আঙিনা। দুদিন থেকে বউ আর ছেলেকে নিয়ে যাবে নিজ বাড়ীতে। এ দুদিনের মধ্যে পারলে আপনাকে একবার যেতে বলেছে।
-রজবালীর বুকের ব্যথা ভালো হয়ে গিয়েছে!
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো অনিরূদ্ধ।
-আমি বললাম কি তাহলে, ও ব্যথা বুকের না, বুকের ভিতর লুকিয়ে থাকা মনের ব্যথা। স্বামী মরা অমন সমত্ত মেয়ে ঘরে থাকলে কোন বাবার বুকে ব্যথা না হয়ে উপায় কি?
পাশের চেয়ারটায় বসে কথাগুলো বলছিল রামদয়াল।
-এ বয়সে স্বামী হারিয়ে মেয়েটার স্বভাব চরিত্রও খারাপের দিকে যাচ্ছিলো। বকাটে ছেলেগুলোওতো সে সুযোগই নিচ্ছিলো।
ওদের আলাপ নীর্লিপ্তে শুনছিলো লাবনী।
-সবাই সুযোগ সন্ধান করে এ দুনিয়াই। আর এটাকে সুযোগ সন্ধানইবা বলবো কেন, মুল দোষটা প্রকৃত পক্ষে দেখা যাওয়া বাইরের শরীরটার, সেটা অন্যের চর্ম চক্ষুর দৃষ্টি থেকে বাচিয়ে রাখা কষ্টকর।
অনিরূদ্ধর মন্তব্যে ওর সাথে দৃষ্টি বিনিময় হলো লাবনীর।

-আমি যাই, বিকেলে রজবালীর ওখানে যেতে চায়লে আমাকে ডেকে পাঠাবেন।
কথাটা বলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল রামদয়াল।
লাবনী তাকিয়ে অনিরূদ্ধর দিকে। এ যেন অচেনা অন্য কোন কেউ। অনিরূদ্ধর এ রূপটাও এতদিন ওর কাছে অজানা ছিল। আসলে ওর মানসপটে আকা অনিরূদ্ধর চেহারাটা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে বলে মনে হলো লাবনীর।
-মানুষের সব শারিরীক অসুবিধার পিছনে মনের যে একটা ভুমিকা আছে এটা জানলেও এতটা বিশ্বাস কোনদিন করিনি। পূর্ণ যৌবনা একটা মেয়ে রজবালীর ঘরে। মেয়েটার স্বামী মারা গিয়েছে তার জন্য ও শোকাবিভূত। কিন্তু তা বলে ওর শরীর ওর মন, সে সব দাবীকে কি করে উপেক্ষা করবে ও। তার উপর অন্যদের লোভাতুর দৃষ্টি।
অন্যমনষ্ক লাবনীর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস টানলো অনিরূদ্ধ।
-ওর বাবা বুকের ব্যাথা নিয়ে আসলো আমার কাছে। রামদয়ালই ব্যাখ্যা করলো রজবালীর বুকে ব্যথার কারণটা।
-ওর মেয়ের বিয়ের জন্য একটা ভাল ছেলের দরকার সেটা অনুভব করলাম দারূন ভাবে। কিন্তু সে ব্যপারে আমার কিছু করার আছে বলে মনে হলো না। তারপর পরিচয় হলো নুরূ মন্ডল অর্থাৎ রজবালীর এখনকার যে জামায় তার বাবার সাথে। সেও এসেছিল রোগী হয়ে। রোগের বাইরে রোগীর সাথে তার মনের খোজ নেয়ার অভ্যাসটা গড়ে তোলার প্রয়াসে ওর কাছ থেকে জানলাম বাবা হিসাবে ওর এখন চিন্তা ভাল একটা মেয়ের সাথে ছেলেটাকে বিয়ে দেয়া।
-নুরূ মন্ডলের বাবার কথা শুনে মনের এক কোণে লালিত একটা প্রশ্নের জবাব যেন পেয়ে গেলাম।
-নিচক কৌতুহলবসতঃ বললাম রজবালীর মেয়ের কথা। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে নুরূ মন্ডলের বাবা তাকালো আমার দিকে। তার ছেলের বিয়ের জন্য আমি মেয়ের সংবাদ দিচ্ছি! ব্যপারটা ওর স্বপ্নাতীত ছিল। আসলে এই দুটো কৃষক পরিবারের ছেলে মেয়ের বিয়ের ঘটকালী করছি ব্যপারটা আমার কাছেও অবিশ্বাস্য লাগলো।
লাবনী অবাক হয়ে শুনছিল অনিরূদ্ধর বর্ণনা।
-পরদিন নুরূ মন্ডল ওর ছেলেকে আনলো আমার কাছে। মেয়েটার আগে একটা বিয়ে হওয়া আর ওর একটা বাচ্চা থাকার ব্যপারটা নিয়ে দারূন আপত্তি করছিলো ছেলেটা। তায় ওর বাবা ওকে বুঝিয়ে বলার জন্য নিয়ে এসেছে। আমার কিছু গদবাধা মানবতার কথা উল্লেখ করে দেয়া যুক্তিতে ওরা রাজি হয়ে গেল।